হেফাজতে অসন্তোষ, সরকারের সঙ্গে সখ্য Reviewed by Momizat on . সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতে ইসলামের শুকরানা মাহফিল হয়।  ভেতরে-ভেতরে দুই পক্ষ আলাদাভাবে কাজ করলেও কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। সংগঠনের একটি অংশ স সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতে ইসলামের শুকরানা মাহফিল হয়।  ভেতরে-ভেতরে দুই পক্ষ আলাদাভাবে কাজ করলেও কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। সংগঠনের একটি অংশ স Rating: 0
You Are Here: Home » জাতীয় » হেফাজতে অসন্তোষ, সরকারের সঙ্গে সখ্য

হেফাজতে অসন্তোষ, সরকারের সঙ্গে সখ্য

সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতে ইসলামের শুকরানা মাহফিল হয়। 

  • ভেতরে-ভেতরে দুই পক্ষ আলাদাভাবে কাজ করলেও কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না।
  • সংগঠনের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে পছন্দ করছে না।
  • এ নিয়ে সাধারণ কর্মীদের ভেতরেও নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ রয়েছে।
  • দুই বছর ধরে সংগঠনের কোনো কর্মসূচি নেই।

হেফাজতে ইসলামের আমিরসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশের সঙ্গে সরকার ও আওয়ামী লীগের সখ্যকে কেন্দ্র করে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সংগঠনের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে পছন্দ করছে না। এ নিয়ে সাধারণ কর্মীদের ভেতরেও নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ রয়েছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘুরে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হলেও বিক্ষুব্ধ অংশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং প্রচারপত্র ছেড়ে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতকে রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছে। এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি ১৫১ সদস্যের। সংগঠনের আমির শাহ আহমদ শফী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাঁর সঙ্গে থাকা নেতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সংগঠনের প্রচার সম্পাদক আনাস মাদানী (আমিরের ছেলে), যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দীন রুহী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ এবং ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি আবুল হাসনাত আমিনী। তাঁদের সঙ্গে সংগঠনের বড় একটি অংশের নেতা–কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

ভেতরে-ভেতরে দুই পক্ষ আলাদাভাবে কাজ করলেও প্রবীণ আলেম আহমদ শফী সবার মুরব্বি হওয়ায় এখনো কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। এই অংশের অন্যতম নেতা নূর হোসাইন কাসেমী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব। তাঁর দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক।

ফয়জুল্লাহ, আবুল হাসনাত আমিনী ও মঈনুদ্দীন রুহী প্রয়াত ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা। তাঁরা আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। তিনজনই চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসন নিয়ে বনিবনা হয়নি।

হেফাজতে ইসলামের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব নেতা বলেন, হেফাজতে ইসলামের সাধারণ নেতা-কর্মীরা চান, হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে থাকবে। তাঁদের ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলেও দুই বছর ধরে সংগঠনের কোনো কর্মসূচি নেই। উল্টো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য গড়েছে নেতাদের একটা অংশ। এর বিনিময়ে হেফাজতের আমিরের ছেলে আনাস মাদানীসহ কয়েকজন নেতা সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সহযোগিতা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, বার্ধক্যজনিত কারণে হেফাজতের আমির ছেলে আনাসের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ঢাকায় শুকরানা মাহফিল না করার জন্য আমিরকে অনুরোধ করা হলেও আনাস মাদানীসহ অন্যরা সেটি আয়োজন করেন সরকারের সহযোগিতা নিয়ে। এ কারণে সংগঠনে বিভক্তি দেখা দিয়েছে।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন আনাস মাদানী। তিনি বলেন, হেফাজতে কোনো বিভক্তি নেই। সব অপপ্রচার। শুকরানা মাহফিলের পরে অনেক মাহফিলে আলেম-উলামারা ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা জানিয়েছেন। বিরোধ থাকলে এটি হতো না।

সম্প্রতি হাটহাজারীতে সরেজমিনে গেলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন দোকানের সামনে শুন শহীদের ডাক শিরোনামে একটি প্রচারপত্র পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘১৩ দফার কথা কেন বলা হয় না? হেফাজতের বিদ্রোহীদের না খুঁজে বিদ্রোহের কারণ খোঁজেন। কেন শুরার মাধ্যমে আমির নির্বাচন করা হচ্ছে না। কেন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আমিরের সখ্য। পাঁচ বছর আগে নেওয়া মহাসচিবের পাসপোর্ট কেন ফেরত দেওয়া হচ্ছে না।’ প্রচারপত্রের নিচে লেখা ‘৫ মে শহীদ পরিবার’। সেখানে আমিরের ছেলে আনাস মাদানীসহ কয়েকজন নেতাকে দোষারোপ করে হেফাজতকে রক্ষার আহ্বান জানানো হয়।

হেফাজতের নায়েবে আমির মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরী গত ২৪ নভেম্বর  বলেন, আদর্শ থেকে সরে দাঁড়ানোয় হেফাজতে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। তিনি আনাস মাদানী ও যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দীন রুহীসহ অনেকের বিরুদ্ধে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ করেন।

এই বিষয়ে মঈনুদ্দীন রুহী বলেন, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের আঁতাত হয়েছে, এমন অভিযোগ তাঁদের কানেও আসে। কিন্তু এসবের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি দাবি করেন, হেফাজতের মধে৵ কোনো বিভক্তি নেই।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমান স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস হয়। এরপর ১ অক্টোবর হাটহাজারী মাদ্রাসায় আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশের ২০১৮ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হেফাজতের আমির আহমদ শফী বলেছিলেন, ‘উনি (শেখ হাসিনা) এটা আমাকে এমনি মহব্বত করে দিয়েছেন। আমি আওয়ামী লীগ হই নাই। আপনাদের এ রকম কথাবার্তা ভুল। কথাবার্তা বলার সময় সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই করে বলবেন। কী করে বলেন, আমি আওয়ামী লীগ হয়ে গেছি। আমি আওয়ামী হলেও কোনো আপত্তি নেই। এ দলে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা দীনকে ভালোবাসেন, আমাদের মাদ্রাসায় সাহায্য করেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহমদ শফীর এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে বিভ্রান্তিতে পড়েন হেফাজতের অনেক নেতা। নেতা-কর্মীদের অনেকে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ৪ নভেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা (কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়ায়) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় হেফাজত। কিন্তু এই আয়োজন না করতে হেফাজতে ইসলামের ৬৮ জন নেতার সই করা একটি চিঠি গত অক্টোবরের শেষ দিকে আমিরকে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, সংবর্ধনা দিলে কওমি আলেমরা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি হয়ে যাবেন। ক্ষুব্ধ হবে সাধারণ মানুষ। পরে সংবর্ধনার নাম পাল্টে ‘শুকরানা মাহফিল’ নামে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করা হয়।

শুকরানা মাহফিলে যাননি হেফাজতের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী, নায়েবে আমির নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরী ও তাজুল ইসলাম, যুগ্ম মহাসচিব ছলিম উল্লাহ ও মো. ইদ্রিস এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীসহ অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা। ২ অক্টোবর সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন নায়েবে আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী। পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে মহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘যে উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজত গঠন করা হয়েছিল, তা থেকে দূরে সরে থাকার কারণে পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি।’

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ৫ মে ঢাকার ছয়টি প্রবেশমুখে অবরোধ কর্মসূচি শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক। ওই দিন রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে হেফাজতের নেতা-কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ ঘটনায় রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের ২২ কর্মীসহ ৩৯ জন নিহত হন বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়। এ ঘটনায় পাঁচ জেলায় মোট ৮৩টি মামলা হয়। হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফীকে কোনো মামলাতেই আসামি করা হয়নি। মামলার আসামি হয়ে কারাগারে ছিলেন মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী।

পাঁচ বছরের মাথায় হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠা এবং সংগঠনে বিভক্তির বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছি না।’

About The Author

Number of Entries : 2324

Leave a Comment

মুক্তগাছা ভবন, বাড়ি নং -১৩, ব্লক -বি, প্রধান সড়ক, নবোদয় হাউজিং, আদাবর, ঢাকা-১২০৭; সম্পাদক ও প্রকাশক; আলহাজ্ব মোঃ সাদিকুর রহমান বকুল ; জাতীয় দৈনিক আজকের নতুন খবর;

Scroll to top